Sunday, 19 January 2020

গবাদিপশুর ফুট রট রোগ নিয়ন্ত্রণ

গবাদিপশুর ফুট রট রোগ নিয়ন্ত্রণ:
ফুট রট গবাদিপশুর পায়ের ক্ষুরের চারপাশে ক্ষুরের মধ্যবর্তী স্থানের টিস্যুর প্রদাহজনিত একটি সংক্রামক রোগ। সকল শ্রেণীর সব বয়সের পশুই (গাভী, বলদ, ষাঁড়, বকনা ইত্যাদি) রোগে আক্রান্ত হতে পারে। রোগকে ইন্টারডিজিটাল নেক্রোব্যাসিলোসিস, ফাউল ইনদি ফুট, ফুট রট বা ইন্টার ডিজিটাল ফ্লেগমন হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে

কারণতত্ব এপিডেমিওলজী:
ফুট রট সাধারণত Fusobacterium necrophorum দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকে তবে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া যেমন Bacterorides melaninogenicus রোগের কারণ হতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে F. necrophorum গবাদিপশুর ইন্টারডিজিটাল চামড়ার মাঝে ইনজেকশন দিলে ইন্টারডিজিটাল নেক্রোব্যাসিলোসিস এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লিশান পরিদৃষ্ট হয়। এই ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ আইসোলেট পরীক্ষা করে দেখো গেছে এরা এবং অই গ্রুপের অর্ন্তভুক্ত। এরা একজাতীয় exotoxinউৎপন্ন করে যা ইনজেকশন করলে গবাদি পশু ইঁদুর আক্রান্ত হয়। আবার লিশান থেকে প্রাপ্ত আর একজাতীয় isolotes যারা ইন্টারডিজিটাল নেক্রোব্যাসিলোসিস হিসাবে শ্রেণীভুক্ত নয় এবং সুস্থ গরুর পা থেকে সংগৃহীত হয় এরা বায়োটাইপ হিসাবে (F. necrophorum subspecies funduliforme) চিহ্নিত হয়। এরা তেমন ক্ষতিকারক নয়। Bacteroides nodosus এর স্ট্রেইন যা ভেড়ার ফুট রট করে তা গবাদিপশুর ক্ষুর থেকে সংগৃহীত হয়েছে তবে তা অল্প বিস্তর ইন্টারডিজিটাল ডার্মাটাইটিস করে থাকে। কিন্তু এরা আবার মারাত্নক ইন্টারডিজিটাল নেক্রোব্যাসিলোসিস রোগের সৃষ্টি করতে পারে

পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়ে থাকে এবং এর ফলে -১০% গবাদিপশু খোঁড়া হয়ে যেতে পারে। সকল বয়সের গরু এবং দুই মাস বয়সের বেশি ভেড়া ছাগলে রোগ দেখা দিতে পারে। বর্ষা স্যাঁৎসেঁতে আবহাওয়ায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়ে থাকে। ডেয়রী খামারের গাভীতে রোগ হলে অত্যন্ত ক্ষতি হয়। দেশী জাতের গরু অপেক্ষা বিদেশী জাতের সংকর জাতের গাভীতে রোগ মারাত্নক হয়ে থাকে। আক্রান্ত গরুর পায়ের ক্ষত হতে নিঃসৃত রস থেকে রোগজীবাণু অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। যদিও রোগ বিচ্ছিন্নভাবে দেখা দেয় তথাপি তা অনুকূল পরিবেশে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে

রোগ বিস্তার:
সাধারণত আক্রান্ত গরু থেকে রোগের বিস্তার ঘটে। আক্রান্ত প্রাণীর ক্ষুরের ক্ষত স্থান থেকে নিঃসৃত রস প্রচুর জীবাণু বহন করে যা থেকে সুস্থ প্রাণী আক্রান্ত হয়ে থাকে। গবাদি পশুর পায়ের ক্ষুরের করোনেট বা দুই ক্ষুরের মধ্যবর্তী স্থানের টিসু্যতে কোনো কিছু দ্বারা আঘাতের ফলে ক্ষত হলে সর্বদা কাদা-পানি বা গোবরের মাঝে পা রাখলে ক্ষতস্থান দিয়ে রোগজীবাণু সহজেই দেহে প্রবেশ করে রোগের সৃষ্টি করতে পারে

এছাড়াও শক্ত স্থান, ধারালো পাথরের নুড়ি অথবা চারণক্ষেত্রের শক্ত ধান বা গমের মুড়া থেকে ক্ষুরের নরম টিসু্য আঘাতপ্রাপ্ত হলে সেখান থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। যে কোনো কারণেই হোক না কেন পা যদি সব সময় ভেজা থাকে তাহলে ক্ষুরের মাঝে ক্ষত হবার সম্ভাবনা বেশি দেখা দেয়। অস্বাস্থ্যকর গোয়াল ঘর হলে রোগের সংক্রমণ বেশি হতে পারে

রোগ লক্ষণ:
আক্রান্ত প্রাণীকে আকষ্মিকভাবে খোঁড়াতে দেখা যায়। সাধারণত এক পায়ে ব্যথা হলেও তা প্রায়শ মারাত্নক হয়ে থাকে। দেহের তাপমাত্রা ১০৩-১০৪ ফা লক্ষ্য করা যায়। ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয় গাভীর দৈহিক ওজন দুধ উৎপাদন হ্রাস পায়। আক্রান্ত ষাঁড় সাময়িকভাবে অনুর্বর (infertile) হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় পায়ের ক্ষতে পুঁজ হয় নেক্রসিস হয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। রোগজীবাণুর সংক্রমণের ফলে অস্থিসন্ধি, সাইনোভিয়া টেন্ডনের প্রদাহ দেখা দেয়। ফলে আক্রান্ত গরু মাটিতে শুয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে। যথাসময়ে চিকিৎসা না করালে ক্ষুর খসে যেতে পারে গরু স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। গরু যদি কয়েক সপ্তাহ যাবৎ খোঁড়াতে থাকে তাহলে দুধ উৎপাদন দারুণভাবে কমে যায় এবং দৈহিক ওজনও হ্রাস পায়। চিকিৎসার অভাবে রোগ যদি খুব জটিল আকার ধারণ করে তাহলে আক্রান্ত প্রাণীকে বাতিল ঘোষণা করতে হয়

রোগ নির্ণয়:
রোগের ইতিহাস বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রোগলক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা যায়। এছাড়া পায়ের করোনেটের ক্ষত পরীক্ষা করে রোগ সনাক্ত করা যেতে পারে
ল্যাবরেটরিতে রোগের জীবাণু সনাক্ত করা যায়। রোগজীবাণু সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করার জন্য পায়ের ক্ষত থেকে সোয়াব নিয়ে গ্রাম স্টেইন ব্লাড আগারে কালচার করে রোগের জীবাণু সনাক্ত করা যায়

রোগ সনাক্তকরণে পার্থক্য:
রোগের লিশানের স্থান, রোগের প্রকৃতি, লিশানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দুর্গন্ধ, পালে রোগের ধরন, ঋতু আবহাওয়া পর্যালোচনা করে ফুট রটে আক্রান্ত গরুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায

ইন্টারডিজিটাল ডার্মাটাইটিস/স্টেবল ফুট রট:
গবাদিপশুকে আবদ্ধ অবস্থায় দীর্ঘ দিন প্রতিপালন করলে সাধারণত রোগ দেখা দিয়ে থাকে। তবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পালন করা হলে প্রায়শ রোগ দেখা দেয়। আবার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পালিত গরুতেও রোগ দেখা দিতে পারে। রোগের কারণ ঠিক জানা না গেলেও আক্রান্ত পশু থেকে Bacteroides সনাক্ত করা গেছে


প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুরের bulb এলাকা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত আঠালো রস নিঃসরণ হতে থাকে। লিশান বেদনাদায়ক হয় কিন্তু অন্য কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না। একাধিক ক্ষুর আক্রান্ত হতে পারে। দীর্ঘ দিন ভুগতে থাকলে ক্ষত মারাত্নক হয় সেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে। স্টেবল ফুটরটে ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসায় তেমন উপকার হয় না তবে ক্ষতস্থানে পরিচর্যা করে সেখানে ব্যাকটেরিয়ানাশক ঔষধ ব্যবহার করলে ফল পাওয়া যায়

No comments:

Post a Comment

ককসিডিওসিস বা রক্ত আমাশয়

ককসিডিওসিস বা রক্ত আমাশয় রক্ত মিশানো পাতলা পায়খানা , রক্ত শূণ্যতা ও শরীরের দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্তি এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য...